আত্নহত্যার পথ বেছে নেওয়া এক সামাজিক ব্যাধি

মঙ্গলবার শ্রাবণের আকাশ সকাল থেকেই মেঘে পরিপূর্ণ ছিল। সারাদিন অঝোর ধারায় শ্রাবনের বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টিস্নাত বিকেলে হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ল অরিন্দম বরুয়া সৈকত নামের একজন শিক্ষার্থী ফাঁসিতে ঝুলে আত্নহত্যা করেছে। শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের খবরকে ছাপিয়ে মনকে বিষাদময় ও ভারাক্রান্ত করে তুলেছে এ আত্নাহুতির খবর।

প্রতি বছর এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর নিউজ পোর্টাল কিংবা পরদিন আমরা খবরের কাগজে শিক্ষার্থীদের সাফল্য কিংবা মিষ্টি বিতরণে যেমন আনন্দিত-পুলকিত হই। তেমনি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া অনেক শিক্ষার্থীর আত্নহত্যার খবরে মন ভারাক্রান্ত হয়। আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের এ প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু এ পথ বেছে নেওয়াতে সফলতা নেই। আছে দুঃখ, হারানোর ক্ষত, অপূরণীয় ক্ষতি। তবে কেন এ আত্নঘাতি সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষার্থীরা। তার মানে তরুণ সমাজ পরাজয়ে ভয় পায়, মেনে নিতে পারে না পরাজয়কে। সবাইকে মনে রাখতে হবে আত্নসমর্পণ করা জীবন নয়। জীবনে পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। সত্যের সম্মুখীন হতে হবে।

তবে এ আত্নঘাতি সিদ্ধান্ত কেন নেয় শিক্ষার্থীরা ? এর দায়ভার কি শুধু আত্নঘাতি সিদ্ধান্ত নেওয়া শিক্ষার্থীর ? নাহ। এর পেছেনে আমাদের প্রচলিত শিক্ষার মান-ত্রুটি, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, শিক্ষা ব্যবস্থা যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাব ও অভিভাবকদের আচরণও  দায়ী।

অরিন্দম বরুয়া সৈকত। থাকতেন কুমিল্লা নগরীর মগবাড়ি চৌমুহনী এলাকায়। কুমিল্লার সাদা মনের মানুষ খ্যাতনামা সাংবাদিক অশোক বরুয়ার সন্তান ।দুই ভাই-বোনের মধ্যে সে ছোট। মঙ্গলবার (২৫ জুলাই) পরীক্ষার ঘোষিত ফলাফলে নিজের ব্যর্থতা সহ্য করতে না পেরে এক বুক কষ্ট নিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারি ছিলেন সৈকত। পড়ালেখা, সংস্কৃতি, মানবিকতা প্রায় কাজেই তার অংশগ্রহণ ছিল। কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে স্বপ্নের পথে এক ধাপ ধাবিত হলেন। স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী হওয়ার। পরে ভর্তি হলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নিলেন এবারের এইচএসসি পরীক্ষায়। এবার ফলাফল পাওয়ার বেলা।

ফলাফল পাওয়ার আগের দিনই ২২ জুলাই সকাল ৯ টা ৯ মিনিটে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিলেন সৈকত। তা ছিল-

ÒAll my bags are packed, I’m ready to go!!

আজকে রাতেই ডিসিশন হবে,এই ঘরে আর থাকতে পারবো কিনা!
ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছি। মানিব্যাগ ও মোটামুটি ভর্তি।
এখন শুধু রেজাল্টটা পাওয়ার অপেক্ষায়  ,কারো বাসায় জায়গা দিবা আমাকে? ”

২৩ জুলাই। এইচএসসির ফলাফল ঘোষণা হল। কুমিল্লায় ফলাফল বিপর্যয় হল। সেই বিপর্যয়ে পড়ল সৈকতের মত মেধাবী ও সম্ভাবনাময় একটি ভবিষ্যত। যে বিষয়টিতে সে অভ্যস্ত ছিল না, সেই করাল স্রোতে ভেসে গেল সৈকত। চারদিকের অন্ধকার ভর করলো তার উপর। এরপরই হয়তো জীবনের একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সম্ভাবনায় মুখ সৈকত।

এরপর ২৩ জুলাই সকাল ১০ টা ৩ মিনিটে সৈকত তার এফবিতে একটি স্ট্যাটাস দিলেন। সেটি ছিল- “মৃত্যু কি শ্রেয় নয়?” এরপরই বিকেল ৩ টায় আরো একটি স্ট্যাটাস দিলেন- “হেরে গেলাম”।

২৪ জুলাই সকাল পৌণে ৯ টায় আরো একটি স্ট্যাটাস দিলেন- “Hanging is a way that is used by many countries around the world to kill those who are given a death penalty. It is considered one of the quickest and easiest ways to kill someone. It is an extremely common way of suicide. When the person is choked it only takes about 5 to 10 seconds for them to lose consciousness before they die ” ‘ অনেক দেশে ফাঁসি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া, এটি মৃত্যুর দ্রুত ও সহজ পথ, আত্মহত্যার ও এটি স্বাভাবিক পথ’।

ঠিক এর ৬ মিনিট পর লিখেছে ‘ সবাইকে মিস করবো, ভালোবাসি সবাইকে ‘।

সকাল ৯ টা ৫৯ মিনিটে শেষবারের মত আরো একটি স্ট্যাটাস দিলেন সৈকত। সেটি ছিল

“এতো জিপিএ ৫-পাশের ভীড়ে,
আমার স্ট্যাটাস গুলো কী কারো চোখে পড়ে?
পড়বে না। পরার কথাও না।

যেদিন আমার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়বে এই নীল সাদার দুনিয়ায়,যেদিন আমার মৃত্যুর খবর পত্রিকায় ছাপবে…ঠিক সেইদিন হয়তো “miss you” #RIP হ্যাশট্যাগে ভড়ে উঠবে ফেইসবুক ওয়াল।
আমার সাথেই চলে যাবে আমার না বলা কথা গুলো!
এইটাই তো দুনিয়া। এইটাই তো একজন মানুষের মৃত্যু পরবর্তী অন্তস্টিক্রিয়া!
এটাই তো হেরে যাওয়া এক সৈনিকের প্রাপ্তি!”

এ কথা গুলোই ছিলো সৈকতের ফেসবুক ওয়ালের শেষ কথা। এ স্ট্যাটাস পরে অনেক বন্ধু কমেন্ট করেছে পাগলামি না করার জন্য, জীবন অনেক বাকি,করার অনেক সময় আছে। কিন্তু কোন অনুরোধই ঠেকাতে পারেনি সৈকতকে।

সৈকতের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বন্ধু মহল, শিক্ষক মহল ও আত্মীয় স্বজনের মাঝে শোকের ছায়া ছড়িয়ে পরে। বুধবার অন্তস্টিক্রিয়ার মাধ্যমে শেষবারের মত পরিবার-স্বজন, প্রিয় বন্ধুদের ছেড়ে এ পরপারে পাড়ি দিলেন  বহুমুখী গুণের অধিকারী সকলের প্রিয় সৈকত।

পরীক্ষার ফলাফল এমন হবে ভাবতেই পারেননি সৈকত। হয়তো ভেবেছিলেন জিপিএ ৫ না পেলে কিভাবে ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন। কিন্তু অকৃতকার্য হবেন, এমন ফলাফল তো প্রত্যাশা করেননি সৈকত। এমন ফলাফলে কার দোষ ছিল ? সৈকত পরীক্ষার খাতায় যথাযথ উপস্থাপন করতে পারেননি নাকি শিক্ষকদের খাতা মূল্যায়ণে কোথাও ভুল ছিল। সৈকত অপেক্ষা করতে পারতো । পুনঃনিরীক্ষণ এর  জন্য আবেদন করতে পারতো। কিন্তু সৈকত কেন এমন করলেন ? তার মত মেধাবী কেন সবাইকে কাঁদিয়ে এ নিষ্ঠুর পথ বেছে নিলেন। সে চলে গেছে । কিন্তু দেশ হারালো একজন মেধাবী মুখ। পরিবার-প্রিয়জন আজীবনের জন্য দুঃখের ভেলায় ভাসঁবে । এটা ঠিক করেনি সৈকত ।

তার কষ্ট পাওয়া আত্না শান্তি পাক। এমন ভুল সিদ্ধান্ত কেউ যেন আর না নেয়। কারণ ব্যর্থতার পরই সাফল্য আসবে। কারণ হারের কারণেই জয়ের স্পৃহা জাগে। আমাদের সন্তানরা যেন এ ভুল পথ আর বেছে না নেয়। অরিন্দমের মত মেধাবী শিক্ষার্থীদের আমরা হারাতে চাই না।

এর দায়ভার আমাদের প্রচলিত শিক্ষার মান। যে বিষয়গুলো সংযোজন করা হয়, সে সব বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে অনেক ক্ষেত্রেই উদাসীন থাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর দায়ভার শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকদেরও আছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রমও ভালোমত মনিটরিং করে না শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। তাই এসব দুঘর্টনার দায়ভার শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এড়াতে পারে না।

সবারই একটা বিষয় খেয়াল রাখা উচিত, যেহেতু এই বয়সের ছেলে/মেয়েরা আবেগের বশে চলেন সেহেতু প্রতিটি পরিবারের অভিভাবকদের উচিত তাদের সন্তানদের সবসময় নিজেদের খেয়ালের আওতায় রাখা। সন্তানের চাল-চলন, সঙ্গ, তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক- টুইটারে তাদের স্ট্যাটাস, সমসাময়িক চিন্তাধারা সম্পর্কে সর্বদা তৎপর থাকা। তাদের সাথে বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার করা উচিত। ছেলেমেয়ের যে কোনো ব্যর্থতায় তাদের পাশে থেকে অভয় -সাহস দিয়ে নতুন করে শুরু করবার উৎসাহ দিতে হবে, সাহায্য করতে হবে। অনেক মা-বাবার অভ্যাস আছে নিজের ছেলেমেয়েদের অন্যের সাথে তুলনা করে অমানবিক আচরণ প্রদর্শন করার। এই অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে।

শিক্ষার্থীদেরও বোঝা উচিত নিজের ভাল মন্দকে । এই ব্যর্থতাই ভষ্যিতের সফলতার চাবিকাঠি। জীবন কোন আবেগতাড়িত প্রতিযোগিতা নয়।সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে জীবন। আবেগকে প্রশ্রয় না দিয়ে বাস্তবতাটাকে বিশ্বাস করা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অতীব জরুরী। এ ব্যাপারে শিক্ষকরা শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী আত্মহত্যার প্রতি নিরুৎসাহিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারেন ।

সর্বোপরি আমাদের সবারই সত্যের মুখো্মুখি হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে । পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে দুর্বার গতিতে বিজয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।

আজকের কুমিল্লা ডট কম






Related News

  • কুমিল্লায় যাত্রীবাহীবাস খাদে পড়ে শিশু নিহত
  • কুমিল্লা বোর্ডে জেএসসি গণিতের নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নে সঠিক উত্তর নেই
  • কুমিল্লার বরুড়ায় রাতের অাধারে শহীদ মিনার ভাঙ্গচুর
  • বেগম জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা করেছে বি এন পির দলীয় নেতা কর্মীরা— সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ
  • চট্রগ্রামের মিরসরাইয়ে ৫ হাজার পিস ইয়াবা ও প্রাইভেটকারসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক
  • পরকীয়ার সন্ধেহে লাকসামে স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন
  • খালেদার গাড়িবহরের পাশে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ
  • পরশুরামে শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গৃহ শিক্ষক গ্রেফতার
  • Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *