,


সংবাদ শিরোনাম:

একটি দূর্ঘটনার ইতিবৃত্ত :; জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ 

একটি দূর্ঘটনার ইতিবৃত্ত ঃ জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ

২০১৮ সালের আগস্ট মাসের ৯ তারিখে সুনামগঞ্জ জেলায় জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করি। যোগদানের পর হতেই রাত ১০ টার পর অপরিচিত নাম্বারে ফোন আসে। ফোন ধরলেই অপর প্রান্ত থেকে বলে বাদাঘাট, বিন্নাকুলি,মাহরাম নদী, আদর্শগ্রাম কিংবা যাদুকাটা নদীর কোন কিনার থেকে অবেধভাবে বালি উত্তোলন করছে। অনেক সময় গভীররাতে মানে রাত ১.০০ টার পরও মোবাইলে কল আসতে থাকে। তাৎক্ষণিকভাবে ইউএনও বা ওসি সাহেবকে ফোন করে বিষয়টি যাচাই করে দেখার জন্য বলা হয়। এরপর যাদুকাটা নদীর ফাজিলপুর বালুমহাল সংলগ্ন বালি উত্তোলনের পর শুরু হয় সদর উপজেলার ধোপাজান নদীতে গভীর রাত্রে অবেধভাবে নদী সংলগ্ন পাড়কেটে বালি উত্তোলন এর অভিযোগ। আসে গভীররাতে মোবাইলে ফোন। আমি পরিচিত অপরিচিত সকল ফোনের কল ধরা আগে হতেই অভ্যাস থাকায় প্রতিটি কল রিসিভ করে কথা বলি। একই ধরনের অভিযোগ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ইউএনও ও এডিসি রাজস্ব সহ অন্যান্য সহকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে আলাপ করে অধিকাংশেরই মতামত হল আমি নতুন এসেছি। সুতরাং আমি বিষয়টি জানি না। আমাকে অপরিচিত ফোন গভীর রাতে না ধরার জন্য তারা অনুরোধ করলেন এই বলে যে, একধরনের মোবাইল পার্টি আছে, যাদের কাছে হালি হালি বিভিন্ন অপারেটর এর সিম আছে। তারা স্থানীয় বালি ব্যবসায়ী ও ইজারাদার এর কাছ থেকে চাঁদা নেয়ার জন্য প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের উর্ধতন কর্তৃপক্ষএর কাছে ফোন করে এবং তাৎক্ষণিক পুলিশ ফোর্স বা ম্যাজিস্ট্রেট হাজির হলে তাদের ক্ষমতা প্রমাণ করে। আসলেই অনেক বড় চক্র এবং পরিকল্পিত। তারপরও আমি রাতে ফোন ধরতে থাকলাম। উল্লেখ্য যে, ফাজিলপুর ও ধোপাজান বালুওমহাল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ মানের বালির জন্য সারাদেশে সিলেট স্যান্ড নামে বিখ্যাত। ফলে বিভিন্ন গ্রুপের অর্পিত সার্থ থাকায় প্রায় ই এটা নিয়ে মহামান্য হাইকোর্ট এ রিট মামলা করে থাকে। আমি নিজেও চিনতাম না। খুব সম্ভবত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে ১.৩০ পর অপরিচিত নাম্বারে ফোন আসলে আমি যথারীতি ধরলে অপাশ থেকে একজন মানুষের কান্নার আওয়াজে উঠে বিস্তারিত জানায় যে ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে নদীর পাড় কাটায় তাদের আদর্শ গ্রামের ঘরবাড়ি ভেঙে পরছে।রাতেই পুলিশ ফোর্স পাঠানো হয় এবং ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। এরপরই সিদ্ধান্ত নিই পরের শনিবার সেই যাদুকাটা নদী সংলগ্ন সকল বালিমহাল সরেজমিনে পরিদর্শন করে স্থায়ী ব্যবস্থা নেবার। সেই জন্যই ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সকালে এডিসি, এডিএম ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বৃন্দকে নিয়ে যাদুকাটা নদীতে বড় ইঞ্জিন নৌকা যোগে পরিদর্শন করতে থাকাকালীন সময়ে হঠাৎই নৌকা ডুবোচরে আঘাত করে। আমি সহ এডিসি রাজস্ব জনাব শফিউল আলম অন্যান্য সহকর্মীগণ নৌকার দুতলায় থেকে পুরো এলাকা দেখছিলাম এবং আমি সবার সামনে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার আগেই উপর থেকে নিচে পড়ে যাই এবং বামপায়ে ব্যাপক আঘাত পাই। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে বড় ধরনের বিপদ হতে আমাদেরকে হেফাজত করেন।পরে সুনামগঞ্জের হাসপাতালে এসে এক্সরে করে জানা যায় পায়ের হাড় না ভাংলেও লিগামেন্ট ইনজুরি হয়েছে। এরপর প্রায় ৭ দিন বেড রেস্ট নিয়ে ব্যথাসহ অফিস করা শুরু করি। সিলেটে এসে চেক আপ করে লিগামেন্ট ইনজুরি নিশ্চিত হই। নভেম্বর মাসে ঢাকায় তিন জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকবৃন্দ তিন ধরনের মতামত দিলে আমি অত্যন্ত কনফিউজড হয়ে পড়ি। একজন নামি-দামি অর্থপেডিকক্স এর অধ্যাপক ত বলেই বসলেন আমার তিনটি লিগামেন্ট ই ক্ষতিগ্রস্ত এবং সামনের টি পুরো ছিড়ে গেছে।তিনি আরও বললেন যে অপারেশন না করলে আগামী তিন মাসের মধ্যে আমার বাম পা শুকিয়ে চলার অযোগ্য হয়ে পড়বে। সুতরাং আমি দেরি না করে তাকে দিয়ে যেন অপারেশন করিয়ে নেই।তিনি একটা প্রাইভেট হাসপাতালের ভিজিটিং কার্ড দিয়ে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেন। তবে তিনি পুরো পুরি সুস্থ হওয়ার নিশ্চয়তাও দিলেন না। যেহেতু সামনে জাতীয় নির্বাচন এবং তিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এর তিন ধরনের মতামত সেহেতু নির্বাচনের পর আরও বিস্তারিত জেনে চিকিৎসা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সুনামগঞ্জ ফিরে আসি। এরপর নিয়মিত ফিজিওথেরাপি ও গরম পানির শেক দিয়ে ভাল থাকার চেস্টা করি।এভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলে পুনরায় ঢাকায় গিয়ে MRI report করাই এবং নিশ্চিত হই যে বাম পায়ের সামনের লিগামেন্ট ছিড়ে গেছে এবং অপারেশন এর বিকল্প নেই। পরিচিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেশের বাইরে চিকিৎসা করার পরামর্শ দিলেন।­

এরপর সুনামগঞ্জের হাওড়ের বাধ নির্মাণ কাজ শুরু হলে জেলা প্রশাসন সহ সকল পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে টানা ৪ মাস মাঠে কাজ করতে হয়। সারাদিন সকল সহকর্মীদের নিয়ে হাওড়ের প্রান্তরে ছুটে বেড়িয়েছি। ৫৭২ টি পি আইসির মাধ্যমে প্রায় ৪৫০ কিমি বাধ নির্মাণ / পুনঃনির্মাণের মাধ্যমে কৃষকের ফসল রক্ষার প্রাথমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। জেলা প্রশাসক সুনামগঞ্জ হিসেবে আমি ৩৪ দিন হাওড়ের বাধের কাজ দেখেছি। সন্ধ্যায় পরে বাসায় ফিরে বাংলো অফিসে বসে অনেক রাত অব্ধি কাজ শেষ করে ঘরে ফিরতাম।মাঝে মাঝে পায়ে গরম পানির শেক দিয়ে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করতাম। কিন্ত কখনো ই ক্লান্তিতে ভুগিনি কিংবা শারীরিক অসুস্থতার জন্য কাজ ফেলে রাখতে পারিনি। প্রায় দিনই অর্ধবেলা অফিস করে ডিডিএলজি সহ এডিসি ও সহকারী কমিশনারদের নিয়ে উপজেলা পর্যায়ে প্রকল্পভিত্তিক পরিদর্শন করে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়েছে। এ কাজে সুনামগঞ্জের বীরমুক্তিযোদ্ধা, সুধীজন,সাংবাদিকবৃন্দ সাথে থেকে তদারকিতে সহায়তা করেছেন।

 সকলের আন্তরিক সহযোগিতায় এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। এরইমধ্যে উপজেলা পরিষদ সাধারণ নির্বাচন আসলে সেটিও ভালভাবে শেষ করি। দায়িত্ব পালনে কখনোই মনে করিনি আমার বাম পায়ের লিগামেন্ট ছেড়া। বরং হাওরে দিনের পর দিন বাঁধের কাজ দেখতে গিয়ে Knee cap/ knee brace টাইট করে বেধে আল্লাহর নাম নিয়ে নেমে পড়েছি। সুনামগঞ্জবাসী আমাকে প্রতিক্ষেত্রে সাহস যুগিয়েছেন।

অবশেষে কৃষকের মুখে কাংখিত হাসি ফুটে উঠে এবং২১/৪/২০১৯ তারিখে সুনামগঞ্জের সকল উপজেলায় কৃষক ভাইদের নিয়ে প্রথম বারের মত ধানকাটা উৎসব করা হয়। প্রতিটা বড় কর্মসূচি শেষ হলে সহকর্মীরা অনুরোধ করেন আমাকে চিকিৎসার জন্য ছুটি নিতে আর আমি ভাবী এরপরে সরকারের বা সুনামগঞ্জের জন্যকি জনগুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি আছে, ফলে তিন চার বার উদ্যোগ নিয়েও চিকিৎসার ছুটি নেয়া সম্ভব হয়নি। হাওর কন্যা সুনামগঞ্জের মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারার চেয়ে আর কোনকিছুকেই বড় মনে হয়নি। সুনামগঞ্জবাসীর প্রতি আমি চির ঋণি।আর কোন সাক্ষাৎপ্রার্থীকে পুরোপুরি না শুনে এবং সমস্যা যথাযথ সমাধান না করতে পারলেও তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করি। খুশি মনে বিদায় করি। সবসময় নিজেকে টেবিলের উল্টো দিকের একজন ভেবে কাজ করার চেষ্টা করি। এটাই আমার কর্মস্পৃহা ও মনোবল বাড়িয়ে দেয়।

মাঠের ৭৫% ভাগ ধান কাটা শেষ হলে ভারতে চিকিৎসার জন্য ২৭/০৪/২০১৯ তারিখে চলে আসি। গত ৩০/০৪/২০১৯ হতে ০২/০৫/২০১৯ তারিখ পর্যন্ত চেন্নাইয়ের গ্লোবাল হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক Dr Ajit Yadav বিস্তারিত চেক আপ করে জানালেন আমার তিনটি নয় একটি মাত্র লিগামেন্ট ইনজুরি হয়েছিল। আমি যদি তাৎক্ষণিক চলে আসতাম তবে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত লিগামেন্ট টি তিনি রিপেয়ার করে দিতে পারতেন। দীর্ঘ ৭ মাস চলাচল করায় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত লিগামেন্ট টি প্রায় ছিড়ে গিয়েছে। এখন অপারেশন এর মাধ্যমে পুনস্থাপনের বিকল্প নেই। অতপর তার তত্ত্বাবধানে গত ০৩/০৫/২০১৯ তারিখে ACL Reconstruction by Arthroscopic surgery সম্পন্ন হয়। প্রায় ৪ ঘন্টাব্যাপি অত্যন্ত পেইনফুল অপারেশনটি হয়। এখন পর্যন্ত তারা কোন হাইপাওয়ার এন্টিবায়োটিক বা পেইন কিলার ঔষধ না দেয়ায় এবং বামপা সার্বক্ষণিক ভাবে সোজা করে রাখায় ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। অপারেশন এর পর হতে টানা ফিজিওথেরাপি চলছে এবং আগামী ১৫/০৫/২০১৯ তারিখে সেলাই কাটার পর আরও এক সপ্তাহ ফিজিওথেরাপি নিয়ে তারপর হয়তো দেশে যেতে পারব।আজও ডাক্তার দেখে বললেন অপারেশন ঠিকঠাক হয়েছে। বাকীটা আমার ভাগ্য আর কর্ম। এই দূর্ঘটনার পর হতে সরকারি দায়িত্ব পালনে সদা নিয়োজিত থাকায় কস্টকর এ অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারি নি। আজ চেন্নাইতে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এটি লিখলাম। বার বার সুনামগঞ্জের মাটি ও মানুষের কথা মনে পড়ছে। সবসময় মনে হয় আমি বুঝি অফিস ফাকি দিয়ে এখানে আছি। দ্রুতই ফিরে যেতে চাই। সকলের আন্তরিক দোয়ায় আশা করি আবার পুরো মাত্রায় কাজে যোগ দিতে পারব। চিকিৎসাকালিন ও পূর্বাপর আমার জন্য আন্তরিক সহযোগিতা ও দোয়া করায় আমি সকলের প্রতি সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা জানাই। সৃষ্টিকর্তা আপনাদের মংগল করুন।

 

পাদটীকা ঃ (১)সেই পরিদর্শন এর পর তাহিরপুর উপজেলার ৪ টি খেয়াঘাটের দীর্ঘদিন যাবৎ ইজারাবিহীনভাবে একটি চক্র মিথ্যা মামলার কাগজ দেখিয়ে নদীর তীর সংলগ্ন বালি সমৃদ্ধ এলাকাকে দেবোত্তর ও ওয়াকফ সম্পত্তি দাবি করে আসছিলেন। তাদের সকল কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে ও শুনানি গ্রহণ করে মিথ্যা অভিযোগ ও মামলার বিষয়ে উচ্চতর আদালতে প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয় এবং লক্ষ লক্ষ টাকার রাজস্ব ফাকি চিহ্নিত করা হয়। এবং এ বছর উনমুক্ত ইজারা পদ্ধতিতে ইজারা প্রদান করা হয়।
(২) রাতের আধারে অবেধ বালি উত্তোলন অনেকটায় নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং সামনের বর্ষাকালে কঠোরহস্তে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
(৩) আরেকটা বড় অর্জন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে ,যার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এ সমস্যার সমাধান হবে।
(৪) মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গেলে অবশ্যই অজানা নাম্বারে ফোন আসবে এবং তা রিসিভ করে সেবা প্রার্থীর অভিযোগ বা কথা শোনার মানসিকতাই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করে।

 

21,269 total views, 1 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রকাশিত সংবাদ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি,পাঠকের মতামত বিভাগে প্রচারিত মতামত একান্তই পাঠকের,তার জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়।

Developed By H.m Farhad

Skip to toolbar