বরুড়ার হোগলা পাটি !

এগুলো যাচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে …

কৃষিপ্রধান এলাকা কুমিল্লার বরুড়ায় বংশপরম্পরায় চলছে হোগলাপাতার চাষাবাদ। এর পাতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা আকৃতির পাটি। এসব পাটিকে হোগলা বলে। বরুড়ায় তৈরি হোগলার পাটি স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। পাইকাররা এসব পাটি কিনে নিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ সারাদেশে সরবরাহ করে। এছাড়াও এগুলো যাচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে।

স্থানীয়রা জানায়, বরুড়ার গ্রামগুলোতে বছরজুড়ে হোগলা তৈরি হয়। বরুড়ার বহু গ্রামে দীর্ঘকাল ধরে হোগলাপাতা চাষ হয়ে আসছে। দরিদ্র কৃষক পরিবারের সদস্যরা বংশপরম্পরায় শত শত বছর ধরে হোগলাপাতার চাষ করছে। বরুড়া উপজেলার পশ্চিম-দক্ষিণের অধিকাংশ গ্রামেই দেখা মেলে হোগলাপাতার জমি। এর মধ্যে দেওড়া, লক্ষ্মীপুর, নিশ্চিন্তপুর, রামমোহন, হুতুয়া, ডলিরপাড়, রাজাপুর, জাগুড়িয়া, দীঘিরপাড়, কচুয়ারপাড়, খোশবাস দক্ষিণ, চালিয়া, চালতাতলী ছোট শাকপুর, সাহার পদুয়া, কাঞ্চনপুর, তলাগ্রাম, আমড়াতলী, জয়নগরসহ বিভিন্ন গ্রামে গেলেই ফসলের জমিতে দেখা মেলে হোগলাপাতার।

কথা হয় কচুয়ারপাড়ের ষাটোর্ধ্ব গৃহবধূ মিলন রানীর সঙ্গে। তিনি জানান, স্বাধীনতার আগে থেকে হোগলা তৈরি করে যাচ্ছি। বংশপরম্পরায় হোগলা তৈরির কথা বললেন একই এলাকার সুরেন্দ্র সরকার (৭৫), নিরঞ্জন (৭০) ও নারায়ণ রায় (৫৫)। তারা জানান, বাপ-দাদার হাতের এই পেশা এখনও ধরে রেখেছি। এই পেশা দিয়ে আমরা আমাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছি।

উপজেলার শাকপুর ইউনিয়নের কাঞ্চনপুর গ্রামের হতদরিদ্র শাহানারা বেগম জানান, তিনি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন ২০টির বেশি হোগলা তৈরি করেন। প্রতিটির মজুরি পান ২০ টাকা করে। তিনি আরও জানান, তার স্বামী নূরে আলম জমি থেকে কাঁচা হোগলাপাতা কিনে সেগুলো শুকিয়ে বাজারে বিক্রি করেন। নিজেদের পরিবারপ্রধান একই কাজ করে বলে জানান কাঞ্চনপুর গ্রামের বিউটি রানী, দীপালি রানী ও ছায়া রানী। হোগলা তৈরির কারিগররা জানান, ছোট

আকারের হোগলাপাতা দিয়ে সাধারণত জায়নামাজ ও মাটিতে বিছিয়ে খাওয়ার উপযোগী পাটি বানানো হয়। সবচেয়ে বড় আকারের একটি হোগলা ৮৫-৯০, আড়াই হাত সাইজের হোগলা ৪০-৪৫ এবং সবচেয়ে ছোট আকারের হোগলা ২০-২৫ টাকায় বিক্রি হয়। সাপ্তাহিক হাটের দিনগুলোতে তারা হোগলাপাতা ও হোগলা স্থানীয় দেওড়া, লক্ষ্মীপুর, রামমোহন, পার্শ্ববর্তী চান্দিনা উপজেলা সদর, সদর দক্ষিণের বিজয়পুর, বাগমারা, বরুড়া উপজেলা সদর, ময়নামতি টিপরা বাজার, দাউদকান্দি ও ইলিয়টগঞ্জসহ বিভিন্ন বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যান। সেখান থেকে পাইকাররা নিয়ে যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায়। কোনো কোনো পাইকার সরাসরি বরুড়ার গ্রামগুলোতে এসে হোগলা কিনে নিয়ে যায়। তারপর রফতানি করে মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ায়।

হরিপদ নামে এক হোগলা চাষি জানান, এখানকার চাষিরা ভাদ্র-আশ্বিন মাসে জমি থেকে হোগলাপাতা কেটে নেন। এরপর রোদে শুকাতে হয়। তারপর পরিবারের সদস্যরাই সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে রাত-দিন তৈরি করে হোগলা।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, বরুড়ার গ্রামগুলোর কমপক্ষে ৫শ’ পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। হোগলাপাতা চাষিরা জানান, সরকারিভাবে উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এখানকার মানুষ হোগলার উত্পাদন বৃদ্ধি করে আরও বেশি লাভবান হতে পারবে।

বরুড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তারিক মাহমুদুল ইসলাম জানান, উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রামের প্রায় ৩৫ হেক্টর জমিতে হোগলাপাতার চাষ হয়। চাষিদের উত্পাদন ব্যয় কম। তিনি জানান, যেসব জমি বছরজুড়ে জলমগ্ন থাকে, সাধারণত সেখানেই হোগলাপাতা চাষ হয়। প্রতি শতকে উত্পাদিত হোগলাপাতা থেকে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা মূল্যের হোগলার পাটি তৈরি হয়।

 






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *