,


সংবাদ শিরোনাম:

মানবতা এবং ক্ষমার নবী

মানবতা এবং ক্ষমার নবী

ডেস্ক রিপোর্ট : শত্রু-মিত্র সবাই তার ক্ষমার চাদরে জায়গা পেয়েছেন সমানভাবে। সবসময় তিনি ছিলেন ক্ষমাশীল।

একবার এক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে জয়নব নামের এক সম্ভ্রান্ত ইহুদি হজরতকে দাওয়াত করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল, খাবারের সঙ্গে বিশ মাখিয়ে হজরতকে মেরে ফেলা। খাবার মুখে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে হজরত বিষের বিষয় বুঝতে পারলেন। ততক্ষণে পাশের সাহাবি বিষমাখা খাবার গিলে ফেলেছেন। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।

জয়নবকে বন্দি করে হজরতের সামনে আনা হল। হজরত জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কেন এমনটি করলে? জয়নব বলল, আপনাকে মেরে ফেলার জন্য। পৃথিবীর যে কোনো সম্রাটই এ নারীকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করে ফেলত। আর এটা বৈধও ছিল। কিন্তু মানবতার নবী, ক্ষমার নবী বললেন- জয়নব! আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।

বদর যুদ্ধের ঘটনা। মুসলমানরা যুদ্ধে জয়লাভ করে। মক্কার যুদ্ধবন্দিরা ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত। এবার তো মুহাম্মদ আমাদের মেরেই ফেলবেন। কিন্তু না। হজরত মুক্তিপণের সুযোগ দিলেন। ধনাঢ্যরা মুক্তিপণ দিয়ে নিজেদের ছাড়িয়ে নিল। কিন্তু যাদের কিছুই ছিল না, তারা কী করবেন?

তাদের হজরত এমনিতেই ছেড়ে দিলেন। যা ছিল যুদ্ধের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। এদের মধ্যে আবু আজজা অন্যতম। তিনি মক্কায় ফিরে গিয়ে কবিতা লেখেন- ‘রাসূল মুহাম্মদের কাছে আমার হৃদয়ের ব্যাকুলতা কে পৌঁছে দেবে! হে মুহাম্মদ! আপনার সঙ্গে যে মিলেমিশে থাকে, আপনার দ্বীন যে গ্রহণ করে, সে কতই না ভাগ্যবান। আর আপনার সঙ্গে যে যুদ্ধ করে, সে তো চরম হতভাগা।’

জন্মের ছয় মাস আগে বাবা হারানো মুহাম্মদকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করেন তার চাচারা। বাবার অভাব পূরণে চাচাদের চেষ্টার কমতি ছিল না। হজরত হামজা ছিলেন তাদের অন্যতম। পিতাতুল্য চাচাকে নির্মমভাবে হত্যা করে কলিজা পর্যন্ত চিবিয়ে খায় আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা। চাচার বুকে বর্ষা বসায় ওয়াহশি। মক্কা বিজয়ের পর আবু সুফিয়ান এবং হিন্দাকে ক্ষমা করে দিলেও ওয়াহশিকে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়।

ওয়াহশি লুকিয়ে লুকিয়ে হজরতের সামনে এসে বলেন, আমি জানি আপানি দয়ার নবী। মানবতা এবং ক্ষমার নবী। আমাকে ক্ষমা করে দিন। এমন জঘন্য অপরাধীকেও হজরত ক্ষমা করে শুদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ দেন।

এক গ্রাম্য ব্যক্তি এসেছেন হজরতের সঙ্গে দেখা করতে। হজরত ভক্ত-সাহাবিদের নিয়ে মসজিদে বসে আছেন। সেও ছিল ওই মজলিসে। একটু পর সে উঠে মসজিদের ভেতরই পেশাব করতে বসে গেল। সাহাবিরা বললেন এই! এই! করছটা কী? মসজিদের ভেতর পেশাব… হজরত সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ওকে ওর কাজ শেষ করতে দাও। পরে পানি দিয়ে ধুয়ে নিও। একবার ভাবুন তো, মসজিদে পেশাব করতে দেখলে আপনি আমি কী পারতাম শত্রুর জন্য এভাবে ক্ষমার ডানা মেলে দিতে।

তার ক্ষমার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল, মক্কা বিজয়ের ঘটনা। সেদিন তিনি যেন ক্ষমার উৎসবে মেতে ওঠেন। তিল তিল করে যারা নবীজিকে কষ্ট দিয়েছে, আজ তারা নবীজির হাতের মুঠোয়। আবু সুফিয়ানসহ মক্কার বড় বড় নেতা এবং সাধারণ জনগণ ভয়ে বিবর্ণ- না জানি মুহাম্মদ আমাদের কী শাস্তিটাই না দেন।

এমন সময় সেই মায়াবী কণ্ঠ থেকে ক্ষমার কোমল ভাষণ ভেসে এলো- ‘আজ তোমাদের কারও ওপর আমার কোনো অভিযোগ নেই। তোমরা সবাই নিরাপদ।’ মুষলধারে যেন ক্ষমার বৃষ্টি ঝরল। আপন পর, শত্রুবন্ধু সবাই সেই ক্ষমার বৃষ্টিতে ভিজল।

মিলাদুন্নবী-সিরাতুন্নবী নিয়ে আমাদের যত উত্তেজনা, যত আগ্রহ, তার সিকি ভাগও কি আছে নবীজির ক্ষমা-উদারতা ও মানবতার আদর্শ? যদি থাকত তাহলে বিশ্বজুড়ে মুসলমানের হাতে মুসলমান এভাবে মার খেত না। একদিনের বিশ্বসম্রাট মুসলিম জাতি আজ বিশ্বগোলামে পরিণত হতো না। কবে আমরা নবীর গোটা জীবনের আদর্শকে জীবনে ধারণ করতে পারব?

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রকাশিত সংবাদ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি,পাঠকের মতামত বিভাগে প্রচারিত মতামত একান্তই পাঠকের,তার জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়।

Developed By H.m Farhad